You are currently viewing মালচিং

মালচিং

মালচিং

মালচিং আধুনিক কুষি প্রযুক্তির মধ্যে অন্যতম, বর্তমান সময়ে খুব জনপ্রিয় প্রযুক্তি, বিভিন্ন ধরনের বস্তু দিয়ে যখন গাছপালার গোড়া, সবজি ক্ষেত ও বাগানের বেডের জমি বিশেষ পদ্ধতিতে ঢেকে দেয়া হয় তখন তাকে বলে মালচ। আর এ পদ্ধতিটি কে বলে মালচিং।

“মালচিং” (Mulching) হলো কৃষিকাজে ব্যবহৃত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি যা মাটির উপরে একটি স্তর দিয়ে ঢেকে দেওয়ার মাধ্যমে উদ্ভিদের শিকড়ের আশেপাশের পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ করে। এই স্তরকে বলা হয় মালচ (mulch)। এটি হতে পারে প্রাকৃতিক বা কৃত্রিম উপাদান দিয়ে তৈরি।
ফসলের ক্ষেতে আর্দ্রতা সংরক্ষণে মালচিং বিশেষভাবে উপকারী, কারণ এ প্রযুক্তি ব্যবহারে ফসল ক্ষেতের পানি সূর্যের তাপ ও বাতাসে দ্রুত উড়ে যায় না। ফলে জমিতে রসের ঘাটতি হয় না এবং সেচ লাগে অনেক কম। মালচিং ব্যবহার করলে জমিতে প্রায় ১০ থেকে ২৫ ভাগ আর্দ্রতা সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়।
মালচিং করার জন্য যেসব মালচ উপাদান ব্যবহার করা হয় সেগুলো হলো জৈব ও অজৈব পদার্থ। উপাদানগুলো হলো-ধান বা গমের খড়, কচুরিপানা, গাছের পাতা, শুকনা ঘাস, কম্পোস্ট, ভালোভাবে পচানো রান্নাঘরের আবর্জনা ইত্যাদি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
গাছের গোড়া, সবজির বেড এবং ফলবাগানে গাছের গোড়া হতে এক থেকে দু’ইঞ্চি (২.৫০-৫.০ সে.মি) দূরে বিভিন্ন ধরনের মালচ ব্যবহার করা যেতে পারে। মালচিংয়ের কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন পদার্থ অবশ্যই ৫ সেন্টিমিটার (২ইঞ্চি) এর বেশি পুরু করে দেয়া ঠিক নয়।
উল্লেখ্য যে, মালচিং পদার্থের পুরুত্ব বেশি হলে তা গাছপালার অনাকাঙ্খিত মূল গজাতে সহায়তা করবে। এমনকি সঠিক মালচিং প্রয়োগে বিভিন্ন ধরনের পোকামাকড়ের আক্রমণও রোধ করা যায়।
শীতকালে মালচ ব্যবহার করলে মাটিতে প্রয়োজনীয় তাপমাত্রা ধরে রাখা সম্ভব হয় এবং গরমকালে মাটি ঠান্ডা থাকে, এমনকি বেশ কিছু পোকামাকড়ের আক্রমণও রোধ করা যায়।
সবচেয়ে বড় কথা মালচিং প্রযুক্তি ব্যবহার করলে পানি লাগে অনেক কম। সেচ খরচ বাঁচে, লাভ হয় বেশি।
পাহাড়ি এলাকা এমনকি টিলা, পাহাড়ের ঢালে বিশেষ করে লালমাটি এলাকায় স্বল্প খরচে মালচিং প্রযুক্তি ব্যবহারের কোনো বিকল্প নেই। ফল গাছ বিশেষ করে লেবু, পেয়ারা, কাঁঠাল, আম, নারিকেল, কলা, কমলা, আনারস, বাতাবি লেবু, পেঁপে, আদা, হলুদ এসব গাছের গোড়ায় মালচিং দিয়ে সম্ভব হলে ১-২ সপ্তাহ পর একবার পানি দিয়েও বেশি সময় রস সংরক্ষণ করা সম্ভব।
মালচিং-এর উপকারিতা:
নালার আর্দ্রতা সংরক্ষণ – মাটি থেকে পানি দ্রুত বাষ্প হয়ে যেতে বাধা দেয়।
অপ্রয়োজনীয় আগাছা দমন – সূর্যালোক না পাওয়ায় আগাছা জন্মাতে পারে না।
মাটির উর্বরতা রক্ষা – প্রাকৃতিক মালচ পচে গিয়ে মাটিকে পুষ্ট করে।
তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ – মাটিকে অতিরিক্ত গরম বা ঠান্ডা হতে দেয় না।
মাটির ক্ষয় রোধ – বৃষ্টির সময় বা বাতাসে মাটির ক্ষয় কমায়।
মালচের ধরন:
প্রাকৃতিক মালচ: খড়, শুকনো পাতা, ধানের তুষ, গাছের ছাল, কম্পোস্ট ইত্যাদি।
কৃত্রিম মালচ: প্লাস্টিক শিট (পলিথিন), বায়োডিগ্রেডেবল ফিল্ম ইত্যাদি।
কোন ফসলের জন্য মালচিং উপকারী?
টমেটো, মরিচ, বেগুন, স্ট্রবেরি, তরমুজ, ঢেঁড়স প্রভৃতি শাকসবজি ও ফলজ ফসলের জন্য খুব উপকারী।
কৃত্রিম মালচ (Artificial Mulch) হলো এমন একটি মালচিং উপাদান যা মানুষের তৈরি এবং সাধারণত প্রাকৃতিকভাবে পচে না। এটি প্রধানত প্লাস্টিক বা অন্যান্য সিনথেটিক (synthetic) উপাদান দিয়ে তৈরি হয়।

কৃত্রিম মালচের ধরন:
ব্ল্যাক পলিথিন (Black Polyethylene Mulch):
সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত।
সূর্যের আলো আটকায়, ফলে আগাছা জন্মায় না।
মাটির আর্দ্রতা ভালোভাবে ধরে রাখে।
সিলভার বা রূপালি মালচ:
সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে।
পোকামাকড় দূরে রাখে (বিশেষত সাদা-মাছি, থ্রিপস)।
গরম অঞ্চলে উপযোগী।
বায়োডিগ্রেডেবল প্লাস্টিক মালচ:
পরিবেশবান্ধব (পরে মাটিতে পচে যায়)।
কৃষকেরা সহজে জমিতে মিশিয়ে ফেলতে পারেন।
পানির ছিদ্রযুক্ত মালচ (Perforated Mulch):
রোপণের স্থান ঠিক রেখে ছিদ্র করা থাকে।
গাছ সহজে বেড়ে উঠতে পারে।
কৃত্রিম মালচ ব্যবহারের উপকারিতা:
আগাছা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর।
পানি ও সেচের খরচ কমায়।
মাটির উর্বরতা বজায় থাকে।
ফলন বৃদ্ধি পায়।
আগাম ফসল উৎপাদনে সহায়তা করে।
কিছু রঙের মালচ (যেমন রূপালি) পোকামাকড় প্রতিরোধ করে।
কিছু সতর্কতা:
দীর্ঘমেয়াদে প্লাস্টিক মালচ পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে যদি সেটা অপসারণ না করা হয়।
খরচ তুলনামূলক বেশি হয় প্রাকৃতিক মালচের চেয়ে।
ব্যবহারের পরে সঠিকভাবে ফেলা না দিলে পরিবেশ দূষণ হতে পারে।
কৃত্রিম মালচ সাধারণত উপাদান, রং, গঠন ও কার্যকারিতা অনুযায়ী বিভিন্ন প্রকারে ভাগ করা যায়। নিচে বিস্তারিত দেওয়া হলো:

উপাদানভিত্তিক কৃত্রিম মালচের প্রকারভেদ:
পলিথিন মালচ (Polyethylene Mulch)
সবচেয়ে প্রচলিত এবং সস্তা।
কৃষি প্লাস্টিক হিসেবে বেশি ব্যবহৃত হয়।
বায়োডিগ্রেডেবল প্লাস্টিক মালচ
পরিবেশবান্ধব।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পচে যায়, জমিতে মিশে যায়।
ফয়েল মালচ (Foil Mulch)
অ্যালুমিনিয়াম বা মেটালিক রঙের।
পোকামাকড় দূর করতে কার্যকর।
রঙভিত্তিক কৃত্রিম মালচের প্রকার:
কালো (Black)
আগাছা দমন করে
তাপ ধরে রাখে
রূপালি/সিলভার (Silver)
আলো প্রতিফলিত করে
পোকামাকড় দূর রাখে
সাদা (White)
তাপ প্রতিফলিত করে
গরম অঞ্চলের জন্য ভালো
লাল (Red)
টমেটো জাতীয় ফসলে ফলন বাড়াতে সহায়তা করে
নীল (Blue)
কিছু গবেষণায় ফলন বৃদ্ধিতে উপকারী দেখা গেছে
হলুদ(Yellow)
বিভিন্ন মথকে আকৃষ্ঠ করার জন্য

গঠনভিত্তিক মালচের প্রকার:
ছিদ্রযুক্ত মালচ (Perforated Mulch)
আগে থেকে গর্ত কাটা থাকে চারা লাগানোর জন্য।
ছিদ্রবিহীন মালচ (Non-perforated Mulch)
রোপণের সময় নিজে গর্ত করতে হয়।
বাংলাদেশের জন্য কৃত্রিম মালচ নির্বাচন করতে গেলে কিছু বিষয় বিবেচনা করতে হয়—আবহাওয়া, মাটির ধরন, ফসলের ধরণ, এবং মৌসুম। নিচে বাংলাদেশ উপযোগী কৃত্রিম মালচ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করছি:

বাংলাদেশের আবহাওয়া ও চাষযোগ্য জমির জন্য উপযোগী কৃত্রিম মালচের ধরন:

১. কালো পলিথিন মালচ (Black Plastic Mulch)
বাংলাদেশে সর্বাধিক ব্যবহৃত মালচ ।
আগাছা দমন করে, মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখে।
শীতকালীন ফসল যেমন টমেটো, বেগুন, ফুলকপি, বাঁধাকপি প্রভৃতিতে খুব উপযোগী।
২. রূপালি/সিলভার মালচ (Silver Mulch)
সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে, ফলে সাদা-মাছি, থ্রিপস, জাবপোকা ইত্যাদি কম হয়।
গ্রীষ্মকালীন ও কীটপতঙ্গ-আক্রান্ত ফসলে, যেমন তরমুজ, বাঙ্গি, ঢেঁড়স, মরিচ ইত্যাদিতে ভালো কাজ করে।
৩. সাদা-কালো মালচ (White-on-Black Mulch)
উপরের দিক সাদা (তাপ প্রতিফলিত করে), নিচের দিক কালো (আলো বন্ধ করে আগাছা দমন করে)।
গরম আবহাওয়ার জন্য ভালো।
গ্রীষ্মে বা দক্ষিণাঞ্চলের জন্য উপযুক্ত।
৪. বায়োডিগ্রেডেবল মালচ (Biodegradable Mulch)
বাংলাদেশে এখনও সীমিত পর্যায়ে ব্যবহৃত হচ্ছে।
পরিবেশবান্ধব এবং জৈব কৃষিতে উপযোগী।
বাংলাদেশে কৃত্রিম মালচ ব্যবহৃত ফসলের তালিকা:
সবজি: টমেটো, মরিচ, বেগুন, ঢেঁড়স, শসা, করলা
ফল: তরমুজ, বাঙ্গি, স্ট্রবেরি
ফুল: গোলাপ, গাঁদা ইত্যাদি
বাংলাদেশের জন্য পরামর্শ:
শীতকালে কালো পলিথিন মালচ খুব কার্যকর বা সিলভার-ব্লাক
গ্রীষ্মকালে সাদা-কালো মালচ ভালো।
মালচের নিচে ড্রিপ সেচ ব্যবহার করলে আরও ভালো ফলন পাওয়া যায়।

Leave a Reply